শুক্রবার ১৭ জুলাই ২০২৬ - ১৪:১৬
ইসরায়েলের নজর কেন সোমালিল্যান্ডে? বাব আল-মান্দাব নাকি আরও বড় কোনো ভূরাজনৈতিক খেলার সূচনা?

ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় অনেক সময় ভৌগোলিক অবস্থান সামরিক শক্তির চেয়েও বেশি নির্ধারক হয়ে ওঠে। সে কারণেই যে অঞ্চলগুলো একসময় আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রান্তে ছিল, আজ সেগুলোই আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: সাম্প্রতিক সময়ে ইসরায়েল ও সোমালিল্যান্ডের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে কেবল কূটনৈতিক নয়, বরং আরও গভীর নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক হিসাব-নিকাশও কাজ করছে।

সোমালিল্যান্ড: আফ্রিকার শৃঙ্গে ইসরায়েলের নতুন কৌশলগত অংশীদার, নাকি আরও বড় পরিকল্পনার অংশ?
প্রথম দৃষ্টিতে ইসরায়েল ও সোমালিল্যান্ডের মধ্যে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা খুব গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে নাও হতে পারে। কারণ সোমালিল্যান্ড এখনো জাতিসংঘের স্বীকৃত স্বাধীন রাষ্ট্র নয়।

কিন্তু বিষয়টিকে যদি কেবল একটি সাধারণ কূটনৈতিক সম্পর্ক হিসেবে দেখা হয়, তাহলে এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি আড়ালেই থেকে যাবে।

বাস্তবতা হলো, অনেক বিশ্লেষকের মতে, ইসরায়েল সাধারণত শুধুমাত্র রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক বিবেচনায় কোনো অঞ্চলের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে না; বরং তার প্রতিটি বৈদেশিক সম্পর্ক বৃহত্তর নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবেই বিবেচিত হয়। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে সোমালিল্যান্ডও ব্যতিক্রম নয়।

মূল প্রশ্ন হলো—সোমালিল্যান্ডের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়ে ইসরায়েল কী অর্জন করতে চায়?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আগে সোমালিল্যান্ড সম্পর্কে সংক্ষেপে জানা প্রয়োজন।

সোমালিল্যান্ড: যে রাষ্ট্র কার্যত আছে, কিন্তু আইনগতভাবে নেই
১৯৯১ সালে সোমালিয়ার প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ সিয়াদ বারি সরকারের পতনের পর দেশটির কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং গৃহযুদ্ধ শুরু হয়।

এ সময় সোমালিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল, যা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে ব্রিটিশ সোমালিল্যান্ড নামে পরিচিত ছিল, একতরফাভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করে এবং নিজেদের সোমালিল্যান্ড প্রজাতন্ত্র নামে অভিহিত করে।

এরপর থেকে সোমালিল্যান্ড নিজস্ব সরকার, সংসদ, সেনাবাহিনী, পুলিশ, পাসপোর্ট, মুদ্রা, প্রশাসনিক কাঠামো এবং তুলনামূলকভাবে নিয়মিত নির্বাচনব্যবস্থা গড়ে তুলেছে।

তবে এখন পর্যন্ত জাতিসংঘের কোনো সদস্য রাষ্ট্র কিংবা আফ্রিকান ইউনিয়ন সোমালিল্যান্ডকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী অঞ্চলটি এখনো সোমালিয়ার অংশ হিসেবেই বিবেচিত।

এই বিশেষ অবস্থান সোমালিল্যান্ডকে একটি অনন্য ভূরাজনৈতিক অবস্থানে নিয়ে গেছে। অঞ্চলটি বাস্তবে স্বাধীনভাবে পরিচালিত হলেও আইনগতভাবে স্বাধীন রাষ্ট্র নয়। আর এই আইনি অনিশ্চয়তাই একে বহিরাগত শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তুলেছে।

বাব আল-মান্দাব: যে প্রণালি ইসরায়েলকে সোমালিল্যান্ডের দিকে টেনে এনেছে
ইসরায়েলের আগ্রহের কারণ বুঝতে চাইলে সংবাদ নয়, বরং মানচিত্রের দিকে তাকানোই যথেষ্ট।

সোমালিল্যান্ড এডেন উপসাগরের উপকূলে অবস্থিত এবং বাব আল-মান্দাব প্রণালির খুব কাছাকাছি অবস্থান করছে। এই প্রণালি লোহিত সাগরকে ভারত মহাসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে এবং এটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনপথ।

এই জলপথ ইসরায়েলের ইলাত বন্দরে প্রবেশের অন্যতম প্রধান রুট। ফলে এখানে যে কোনো ধরনের অস্থিতিশীলতা সরাসরি ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের 'আল-আকসা তুফান' অভিযানের পর ইয়েমেনের আনসারুল্লাহ (হুথি) বাহিনী ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট জাহাজে হামলা শুরু করলে বাব আল-মান্দাব শুধু একটি বাণিজ্যিক নৌপথই নয়, বরং লোহিত সাগরে ইসরায়েল ও ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর মধ্যকার কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রেও পরিণত হয়।

এই পরিস্থিতির পর ইসরায়েলের কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গিতে আফ্রিকার শৃঙ্গের উপকূলীয় অঞ্চলগুলোর গুরুত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে ইসরায়েলের কয়েকটি নিরাপত্তা গবেষণা প্রতিষ্ঠান সোমালিল্যান্ডকে ইয়েমেনের নিকটবর্তী অবস্থান এবং এর ভৌগোলিক গুরুত্বের কারণে গোয়েন্দা নজরদারি, লজিস্টিক সহায়তা এবং লোহিত সাগরের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য সম্ভাব্য উপযুক্ত স্থান হিসেবে মূল্যায়ন করেছে।

এছাড়া, বিভিন্ন প্রতিবেদনে সোমালিল্যান্ডের বেরবেরা বন্দরের প্রতি তেল আবিবের আগ্রহের কথাও উঠে এসেছে।

এসব বিশ্লেষণ একসঙ্গে বিবেচনা করলে এমন একটি চিত্র ফুটে ওঠে যে, উত্তরাঞ্চলে যেমন ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে নিজের কৌশলগত গভীরতা বাড়ানোর চেষ্টা করেছে, তেমনি এখন পশ্চিম এশিয়ার দক্ষিণ প্রান্তের এই গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক প্রবেশপথেও নিজেদের অবস্থান সুসংহত করতে চাইছে।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে সোমালিল্যান্ড ইসরায়েলের কাছে কেবল একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল নয়; বরং এটি বাব আল-মান্দাবে নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা উপস্থিতি বাড়ানোর সম্ভাব্য প্ল্যাটফর্ম হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।

ইসরায়েলের লক্ষ্য কি শুধুই নিরাপত্তা?
বিশ্লেষকদের মতে, এর উত্তর— না।

ইসরায়েল অতীতেও বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুকে নিরাপত্তা কৌশলের সঙ্গে যুক্ত করে ব্যবহার করেছে।

সোমালিল্যান্ডের জন্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অর্জন। বহু দশক ধরে অঞ্চলটির নেতৃত্ব এ ধরনের স্বীকৃতির অপেক্ষায় রয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে, যদি ইসরায়েল কোনো ধরনের রাজনৈতিক সমর্থন দেয়, তবে বিনিময়ে গোয়েন্দা সহযোগিতা, নিরাপত্তা সমন্বয়, বন্দর ব্যবহারের সুযোগ, নিরাপত্তা বাহিনীর প্রশিক্ষণ এবং আফ্রিকার শৃঙ্গে প্রভাব বিস্তারের মতো বিভিন্ন সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা করতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

অন্যদিকে, কয়েকটি ইসরায়েলি গণমাধ্যমে গাজার কিছু ফিলিস্তিনিকে সোমালিল্যান্ডে স্থানান্তরের ধারণা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। যদিও এ ধরনের পরিকল্পনা এখনো বাস্তবায়নের পর্যায়ে যায়নি এবং আনুষ্ঠানিকভাবেও নিশ্চিত করা হয়নি, তবুও বিষয়টি আলোচনায় আসা থেকে বোঝা যায় যে, ইসরায়েলের কিছু নীতিনির্ধারণী মহল সোমালিল্যান্ডকে কেবল নিরাপত্তা সহযোগী নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবেও বিবেচনা করছে।

বাকু থেকে দামেস্ক, দামেস্ক থেকে বাব আল-মান্দাব—ইসরায়েল কি নতুন কৌশলগত বলয় গড়ছে?
সাম্প্রতিক আঞ্চলিক ঘটনাপ্রবাহ একসঙ্গে বিবেচনা করলে সোমালিল্যান্ড আর বিচ্ছিন্ন কোনো ইস্যু বলে মনে হয় না। বরং এটি পশ্চিম এশিয়া ও আফ্রিকার শৃঙ্গে ইসরায়েলের বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের একটি অংশ হিসেবেই প্রতীয়মান হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব সীমিত করা এবং মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য নিজেদের অনুকূলে আনার লক্ষ্যে বিভিন্ন কৌশল অনুসরণ করে আসছে।

সিরিয়ার পরিবর্তিত পরিস্থিতি, ইরানের উত্তর সীমান্তসংলগ্ন আজারবাইজানের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং এখন সোমালিল্যান্ডের কৌশলগত উপকূলে উপস্থিতি জোরদারের প্রচেষ্টা—প্রতিটি ঘটনাই আলাদা হলেও, একসঙ্গে বিবেচনা করলে এগুলো একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক কৌশলের অংশ হিসেবে দেখা যায়।

এই বিশ্লেষণ অনুযায়ী, লক্ষ্য হতে পারে গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সক্ষমতা বৃদ্ধি, ইরান-সমর্থিত আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলোর ওপর চাপ বৃদ্ধি এবং ককেশাস থেকে বাব আল-মান্দাব পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক করিডোরে কৌশলগত প্রভাব সুদৃঢ় করা।

এই প্রেক্ষাপটে সোমালিল্যান্ডকে কেবল আফ্রিকার শৃঙ্গের একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হিসেবে নয়, বরং ইরান ও তার আঞ্চলিক মিত্রদের ঘিরে ইসরায়েলের বৃহত্তর নিরাপত্তা কৌশলের একটি সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha